কামরুল ইসলাম, দেলদুয়ার (টাঙ্গাইল):

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা, টাঙ্গাইলের কৃতি সন্তান মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক প্রয়াত ব্যারিস্টার শওকত আলী খানকে এ বছর স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। তাকে এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মঙ্গলবার (১২ মার্চ) পৃথক একটি আদেশ জারি করেছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে এ বছর স্বাধীনতা পুরস্কারে মনোনীত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ১৩ হলো। এর আগে গত রবিবার (১০ মার্চ) জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে পৃথক প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২৫ মার্চ রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে স্বাধীনতা পুরস্কার তুলে দেবেন।

উল্লেখ্য, শওকত আলী খান ১৯২৬ সালের ৯ ফেব্রেুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শওকত আলী খান শৈশবে পিতার ব্যবসা কর্মস্থল ইয়াঙ্গুন (মায়ানমার) হতে বাল্যশিক্ষা লাভ করেন। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ হতে ইন্টারমিডিয়েট, স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ডিসটিংকশনসহ বি.এস.সি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি লন্ডনের লিংকন্সইন বিশ^বিদ্যালয় থেকে ব্যারিস্টারী পাস করেন।

দেশে ফিরে তিনি ১৯৫৬ সালে ঢাকা হাইকোর্ট ও ১৯৬১ সালে পাকিস্থান সুপ্রিমকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন তিনি। ১৯৫৮ সালে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার জ্যেষ্ঠ কন্যা ও কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থার পরিচালক বিজয়া (রমলা) সহার সঙ্গে শুভ পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। ১৯৭০ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মির্জাপুর-নাগরপুর আসনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আলোচনার পর তাকে বঙ্গবন্ধু নিজ এলকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ২৪ মার্চ তিনি নিজ গ্রাম লাউহাটীতে চলে আসেন। তিনি যুদ্ধের জন্য ভারত থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। পরে ১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসে গেরিলা বাহিনীর একটি কোম্পানিসহ দেশের ভেতরে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

স্বাধীনতার পর তিনি সংবিধান রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন। ১৯৭২ সালে টাঙ্গাইলের নাগপুর এবং মির্জাপুরের সাবেক সংসদ সদস্যও ছিলেন তিনি। এছাড়া শওকত আলী খান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ও আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

শওকত আলী খান দেলদুয়ার লাউহাটিতে পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘লাউহাটি আরফান কলেজ’ ও ‘লাউহাটি আজহার উদ্দিন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়’। তিনি হামদর্দ ওয়াকফ বাংলাদেশের ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন, কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বিডি) লিমিটেডের একজন অন্যতম পরিচালক ছিলেন, সাপ্তাহিক ‘জনতা’ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, মাওলানা আব্দল হামিদ খান ভাসানীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। এই মহৎ, সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষটি ২০০৬ সালের ২৯ জুন মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

ওই তালিকায় এ বছর স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (মরণোত্তর), শহীদ এটিএম জাফর আলম (মরণোত্তর), আ ক ম মোজ্জাম্মেল হক, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ডা. কাজী মিসবাহুন নাহার, মরহুম আব্দুল খালেক (মরণোত্তর), অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ (মরণোত্তর), চিকিৎসাবিদ্যায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম, সমাজ সেবায় ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, সংস্কৃতিতে মুর্তজা বশীর, সাহিত্যে হাসান আজিজুল হক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে ড. হাসিনা খান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। স্বাধীনতা পদকের ক্ষেত্রে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ১৮ ক্যারেট মানের ৫০ গ্রাম স্বর্ণের পদক, পদকের একটি রেপ্লিকা, ৩ লাখ টাকা ও একটি সম্মাননাপত্র দেয়া হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here