স্মৃতিচারণ—

একটি কলম এবং ৫০ টাকা

১৯৯৮ সালে আমি যখন এসএসসি তে ফাস্ট ডিভিশন পেলাম তখন আমার ধারনা সব চেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন তাজু ভাই। উনার বাড়ি আর আমার বাড়ি একই গ্রামে। দূরত্ব মাঝে ছোট একটা বিল। উঠানে বসে আমরা কি করি উনারা দেখেন। আমরাও উনাদের দেখি। জোরে ডাক দিলে শুনি। উনার মাকে আমরা মাসি ডাকি। দরকার হলে উনাদের ক্ষেত থেকে এটা ওটা নিয়ে আসেন আমার মা। মাঝে মাঝে আমরাও যেতাম।

উনি দৈনিক আজকের কাগজের লামা প্রতিনিধি। আমি তখন ক্লাস এইটে। উনি যখন ভোরের কাগজে তখন আমি মেট্রিক দিলাম। সে সময়ে লামা মুখ মাঠে আশপাশের গ্রামের সবাই মিলে খুব বল খেলতাম। আমাদের রাজবাড়ির টিম টিও ছিল খুব নাম করা। সাবেক বিল ছড়ি, মেরাখোলা, চম্পাতলী, লামা মুখ এর সাথে ম্যাচ খেলতাম। আমরা জিতলে আজকের কাগজে ভিতরের পাতায় উনি নিউজ করতেন। রাজবাড়ি ইয়ং স্টার ক্লাবের বিজয়। অনুপ্রেরনা পেতাম।

আমার এস এস সি পরীক্ষার রেজাল্টের পরের দিন তাজু ভাইয়ের সাথে লামা কোর্ট মসজিদের সামনে দেখা। উনি কাছে ডাকলেন। রেজাল্ট এর খবর নিলেন। বললেন খুব ভাল। আরো ভাল কর।খুব খুশি হইলাম। তিনি পকেট থেকে ৫০ টা টাকা আমার হাতে দিলেন। বললেন, ভাই খোকা বাবুর দোকানে যাই মিস্টি খাইস। উনার পকেটে থাকা খুব সুন্দর কলমটি আমার পকেটে দিলেন। সে দিন আমার গায়ে ছিল হকার মার্কেট থেকে বড়দার কিনে দেওয়া ক্রিম কালারের একটি টিশার্ট। ক্ষুদ্র জ্ঞানে চিন্তা করলাম সাংবাদিকদের কলম সৈনিক বলে। এজন্য মনে হয় কলম দিয়েছে।কলমটা কলমের জায়গায় রেখে দিলাম।

স্বপ্ন আমার আকাশ সমান। চট্টগ্রামের কোন কলেজে ভর্তি হতে চাইলাম পরিবার দিল না। লামা কলেজে নাম লিখালাম। জড়িয়ে গেলাম ছাত্ররাজনীতিতে। বিভিন্ন দিবসে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা ভাইয়ের কাছ থেকে ১৫০/২০০ টাকা নিয়ে বন্ধুরা মিলে রাত জেগে রাস্তায় আল্পনা করতাম। মাঝে মাঝে উনার সাথে দেখা হত। সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টা বা ৮ টার দিকে সঞ্জয়ের দোকানের সামনে পেতাম। বলতো,” চল ঘরত যাইগই “।

তাজু ভাই প্রথম আলোর নাম করা লামা প্রতিনিধি। প্রতিসপ্তাহে আলোকিত চট্টগ্রামে নিউজ দেখতাম বাই নেইমে। সাংবাদিকতা বুঝতে শিখলাম। ভালোলাগা শুরু হল। ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বিভাগে পাস করলাম। তখন লামার ছাত্রলীগের রাজনীতিতে আমি একজন এক্টিভ কর্মী। জহির ভাই, নেজাম ভাই, খালেক ভাই, বাথোয়াইচিং দা, প্রদিপ দা সহ সবার সাথে মিছিল মিটিং নিয়ে ব্যস্ত।

২০০১ সালে আমি ভর্তি হবার সু্যোগ পেলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনের সময় মিছিলে মারামারি হয়েছিল। আমরা ছিলাম মারামারিতে। আওয়ামীলীগ নির্বাচনে হারলো। আমার লামায় যাতায়াত কমে গেল। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রাজনীতি, পড়ালেখা আর টিউশনি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।

লামা পৌরসভা হল। তাজু ভাই ২০ হাজার টাকা নিয়ে ইলেকশনে নামলেন। ৫ নাম্বার ওয়ার্ডের মানুষ উনাকে ভোট দিয়ে কমিশনার করলেন। তারপরে উপজেলা।মেয়র ইসমাইল ভাই। তিনি উপজেলায় নির্বাচন করলেন। জয় পেলেন। তাজু ভাইকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র দিয়ে তিনি উপজেলায় চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব নিলেন।

২০০৮ সালের দিকে আমি উচ্চাশিক্ষার পাঠচুকিয়ে ঢাকায় চলে গেলাম। প্রথম আলোর হেড অফিসে জয়েন করলাম প্রথম চাকরিতে। আবার যোগাযোগ হল তাজু ভাইয়ের সাথে। মফস্বল ডেস্ক এর সহকারী সম্পাদক ওয়ারেছ ভাইয়ের সাথে মাঝে মাঝে কথা বলিয়ে দিতাম। তাজু ভাই বলতেন, আমি ভারপ্রাপ্ত মেয়রের পাশাপাশি প্রতিনিধি হিসেবে থাকতে চাই। কিন্তু নিয়মের বাইরে যেতে পারলো না প্রথম আলো।
রাজবাড়ির” বুইচ্ছানির মা ” কে নিয়ে প্রথম আলোর ছুটির দিনে প্রকাশিত হল আমার লেখা। তাজু ভাই খুব খুশি হলেন। একদিন দেখা হল রাজবাড়ি। তিনি আমায় বললেন” তুই আমার কলমের দাম রাখছত”।

সময় গাড়ি চলছে। রাজনীতি আর জনসেবায় তিনি ব্যস্ত। আমিও চাকরি আর রাজনীতি নিয়ে। মাঝে মাঝে দেখা হত রাজনীতির মাঠে। যে যার মত কাজ করতাম।গত ইলেকশনে লামার মুখ স্কুল কেন্দ্রে উনিসহ সবাই মিলে নৌকার বিজয় নিশ্চিতে কাজ করেছি। মরহুম ইসমাইল ভাই আর প্রথম আলো প্রতিনিধি বন্ধু খগেশপ্রতি গাড়ি থেকে নেমে চমকে দিয়েছিল আমাদের। বলছিল সেনাবাহিনী থেকে যেন নিরাপদে থাকি।

গত তিনমাস আগে বাড়িতে গিয়েছিলাম। গ্রামের ভাগিনা সজলের বিয়ে উপলক্ষে । তাজু ভাই ও জাপান বড়ুয়ার সাথে সে বিয়েতে দেখা। এক সাথে খেলাম। অনেক কথা হল।পরদিন সকালে রামু গেলাম একটা অনুস্টানে যোগদান করতে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলাম। পরদিন সকালে আমাকে ফোন দিলেন তাজু ভাই। বাড়ির নিচে দোকানে বসে। আমি কি যেন করছিলাম। তাই যেতে দেরি হওয়ায় উনি চলে গেলেন। দুপুরে দেখা দোকানের সামনে। উনি যাবেন বাজারে। আমাকে জোর করে লাল চা খাওয়ালেন। নিজেও খেলেন। আমার খোজ খবর জানলেন। জেলা পরিষদের সদস্য পদ নিয়েও কথা হল। পরদিন আমি ফিরে আসলাম চট্টগ্রাম। তিন মাস পর তাজু ভাই অসুস্থ হয়ে আসলেন চট্টগ্রাম। ভর্তি হলেন চট্টগ্রাম মেডিকেলের রেডজোন এ। খবর পেয়ে আমি এই কঠিন সময়েও ঘরে বসে থাকতে পারিনি। চেস্টা করেছি নিজের অবস্থান থেকে। মহান সৃস্টিকর্তা উনাকে নিয়ে গেলেন।

হাসপাতাল থেকে তাজু ভাইয়ের মরদেহ বহনকারী এম্বুলেন্স যখন চলে যাচ্ছিল আমার বুকটা ভেংগে যাচ্ছিল। মনের অজান্তে চোখ দিয়ে পড়ছিল জল। আমি কথা বলতে পারলাম না। হাত তুলে বিদায় দিলাম। আমার শরীর থর থর করে কাঁপছে।

বিদায় দিলাম আমার একজন অতি আপনজনকে। আমার নাড়িকাটা গ্রামে আমার মত করে আমাকে হয়তো আর কেউ বুঝবে না। রাজবাড়ি গ্রামের একটি বাতি নিভে গেল। আমরা হারিয়ে ফেললাম একটি বটবৃক্ষ কে। বেচে থাকলে হয়তো বুঝতাম না। এখন বুঝতে পাচ্ছি।

তাজু ভাই আমাকে মাফ করবেন। বিভিন্ন কারনে আমি নিরবে আপনার মনে হয়তো অনেক ব্যথা দিয়েছি। আমাকে মাফ করবেন প্লিজ। আমি আপনার কাছে মাফ চাইতে পারিনি। আমাকে মাফ করবেন।

লেখক,
নিবারণ বড়ুয়া
সেকশন অফিসার
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here